বাংলাস্ফিয়ার: সপ্তমীর সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যা এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে উত্তর কলকাতাকে। চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজো মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড় এবং হুড়োহুড়িতে ১৯টি তাজা প্রাণহানির সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর কেটে গেছে ছ’টি দিন। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শহরবাসীর বুক থেকে শোকের ভারী পাথর এখনও নামেনি। ঠিক এই পটভূমিতেই আজ, শনিবার কড়া পুলিশি নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে অবশেষে শুরু হলো সেই পুজোর প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রক্রিয়া।

দুর্ঘটনার পর থেকেই অপরাধের ঘটনাস্থল এবং পুরো মণ্ডপ চত্বর সিল করে দিয়েছিল প্রশাসন। বিজয়া দশমীর পুণ্যলগ্নে প্রথা রক্ষার খাতিরে কেবল ঘট বিসর্জনের আচারটুকু কোনোরকমে সারা সম্ভব হয়েছিল। তবে মামলার তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া এবং আইনি জটিলতার কারণে এতদিন বড় প্রতিমা স্পর্শ করার বা বাইরে আনার কোনো অনুমতি ছিল না। অবশেষে সমস্ত আইনি দিক খতিয়ে দেখে এবং তদন্তকারী সংস্থার নির্দেশ মেনে আজ প্রতিমা গঙ্গার ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মণ্ডপের যে অংশে মারাত্মক ভিড় ও দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল, সেই ঘটনাস্থল এবং পিছনের অংশটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও অক্ষত রাখা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে কোনোভাবেই যেন প্রমাণের হেরফের না হয়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে পুলিশ। এর মাঝেই সামনের পথ কিছুটা প্রশস্ত করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে প্রতিমা বাইরে বের করে ট্রাকে তোলা হয়। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের বদলে এক ভারী ও নিঃশব্দ পরিবেশে সম্পন্ন হলো এই নিরঞ্জন পর্ব।

এত বড় একটা বিপর্যয়ের ক্ষত বুকে নিয়েও এলাকার মানুষের মুখে বারবার ফিরে এসেছে পুজোর মৌলিক রীতিনীতির কথা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, আড়ম্বর, জাঁকজমক বা থিমের এই অন্ধ দৌড় যদি কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়, তবে প্রথা মেনে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখাটাই আসল কর্তব্য। বাহ্যিক চাকচিক্য আর অতিরিক্ত প্রদর্শনী যে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, সেই নির্মম সত্য আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে উত্তর কলকাতা। আনন্দ উদযাপনের জায়গায় আজ কেবলই জমাট বেঁধে রয়েছে একরাশ আক্ষেপ ও দীর্ঘশ্বাস।

এদিকে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার নেপথ্যে আসল সত্য কী ছিল, কোথায় ছিল প্রশাসনিক বা আয়োজনগত গাফিলতি—তা খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে প্রশাসন। ঘটনার গভীরে গিয়ে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গঠিত হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের ছ’সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT)। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর সুযোগ্য ও কঠোর নেতৃত্বে এই তদন্ত প্যানেল তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। কীভাবে এমন বিপর্যয় ঘটল এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে, তার স্থায়ী প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পথ খোঁজার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই সিট তাদের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট আদালতের কাছে জমা দেবে বলে জানা গিয়েছে।

চোরবাগানের এই ঘটনা শুধু একটি পুজোর ট্র্যাজেডি নয়, এটি সমগ্র উৎসব সংস্কৃতির সামনে এক বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। একদিকে যখন আইনের শাসন ও সিট-এর কড়া তদন্ত চলছে, অন্যদিকে তখন প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো এক বিবর্ণ ও রক্তস্নাত উৎসবের অধ্যায়। উত্তর কলকাতার চত্বরে এখন কেবলই পুলিশি পাহারা, কৌতূহলী মানুষের ভিড় আর নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসের এক স্তব্ধ নীরবতা।